বর্ধমান জ্বর; ১৮৭১ এর বাংলার এক অস্বাভাবিক মহামারী - Pralipta

সায়ন দাস : 
"কোথা ওহে দয়াময় কোথা ওহে দয়াময়।
দেখা দেহ দেখা দেহ বিপদ সময়।।
বুঝি তব সৃষ্টি যায় বুঝি তব সৃষ্টি যায়।
তুমি বিনা কেবা রাখে করে সদুপায়।।
এ কি হল দেশে জ্বর এ কি হল দেশে জ্বর।
জ্বর জ্বর রব সদা শুনি নিরন্তর।।
জ্বরে কেহ নাহি বাকি জ্বরে কেহ নাহি বাকি।
অচেতন পড়ে আছে কেবা মেলে আঁখি।।
জ্বরে দুঃখি লোক যত জ্বরে দুঃখি লোক যত।
মস্তকেতে হাত দিয়া কাঁদে অবিরত।।
কোথা পাবে টাকা কড়ি কোথা পাবে টাকা কড়ি।
একালেতে নাহি খাটে কবিরাজ বড়ি।।
চাহি ঔষধের দাম চাহি ঔষধের দাম।
কোথা পাবে মিকচর তুমি যারে বাম।।
কত অকালেতে মলো কত অকালেতে মলো।
দীনের দুর্গতি শুনে চক্ষে আসে জল।।
কত খালি হল শিসে কত খালি হল শিসে।
দিবানিশি আছে লোক ঔষধেতে মিশে।।
তবু নাহি যায় জ্বর তবু নাহি যায় জ্বর।
জীবের আরোগ্য কর দয়ার সাগর।।"

প্রকাশ: ১৮৭১ সালে ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই কবিতাটি যেটি লিখেছিলেন ঊনবিংশ শতকের অন্যতম আলোকপ্রাপ্তা এবং প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী লক্ষ্মীমণি দেবী।

প্রায় দেড়শো বছর আগের কথা। বাংলায় প্লেগ মহামারির আগেই বর্ধমান জেলায় এসেছিল এক মারণ রোগ৷ উজাড় হয়ে গিয়েছিল একের পর এক গ্রাম, জনপদ। ক্রমেই যা মহামারির আকার নেয়৷ সেই জ্বরের নাম দেওয়া হয়েছিল বর্ধমান ফিভার৷

শুধু বর্ধমানেই নয়, ধীরে ধীরে এই জ্বর ছড়িয়েছিল চব্বিশ পরগণা, নদিয়া হুগলি এবং আজকের হাওয়ায় (হুগলি)। সবথেকে বেশি এই জ্বরে মৃত্যুর হার ছিল হুগলি তথা আজকের হাওড়া জেলায়। এছাড়া হুগলি সহ অন্যান্য ওই জেলাগুলিতেও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল৷ শ্মশানে পরিণত হয়েছিল এক একটি জনপদ। তবে বর্ধমানে তা স্থায়ী হয়েছিল বহু বছর। এই মারণ জ্বরে বর্ধমানে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল।

১৩০৫ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ ‘অনুসন্ধান’ পত্রিকার প্রতিবেদনে জানা যায়, সেই সময়ে কলকাতার লোকের আতঙ্ক ভয়ানক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সকলেই কাজকর্ম, বাসস্থান ফেলে রেখে পরিবারকে নিয়ে শহর ত্যাগ করে গ্রামের উদ্দেশ্যে চলে যেতে লাগলো। সর্বসাধারণের সেই আশঙ্কা, সেই ভয়, সেই ভাবনা সহজে বর্ণনা করা যায় না। কেও রেলওয়ে স্টেশনের অভিমুখে, কেউ স্টিমার ঘাটের অভিমুখে, কেও নৌকোর সন্ধানে, কেও গাড়িতে, কেও পদব্রজে - যে যেমনভাবে পাড়লো, শহর ছাড়তে শুরু করলো। হাজার হাজার লোক তখন হাওড়া স্টেশনের অভিমুখে ছুটতে লাগল। আর সেই কারনেই হয়তো হাওয়াতেই সবচেয়ে বেশি সেইসময়ে মৃত্যুর হার বেড়েছিল। স্টেশনে এত বেশি যাত্রী হল যে, টিকিটের সংখ্যা কম পড়ে গেল। অবস্থা বুঝে রেল কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ট্রেন ছাড়াও অতিরিক্ত তিনখানা ট্রেনের বন্দোবস্ত করেছিলেন। তা হল না, শেষে মালগাড়িতে লোক নিতে বাধ্য হল। শেষে সেই সময়েও কোয়ন্টাইন জারি হয়েছিল।

মেদিনীপুর : এই জ্বরের প্রভাব মেদিনীপুর জেলার উত্তর থেকে দক্ষিণে, সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েক বছর জ্বরের দাপটও থাকে। জ্বরে মেদিনীপুরে প্রায় দু’লক্ষ ৫০ হাজার বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছিল। ১৮৮১ সালে আবার মহামারি দেখা দেয় জেলার পূর্ব দিকে (তমলুক)। এবং তা দ্রুতই দক্ষিণ দিকে কাঁথিতে ছড়িয়ে পড়ে। গবাদি পশুও মহামারির হাত থেকে রক্ষা পায়নি। ১৮৬৮ সালে প্লেগ মহামারি দেখা দেয়। তাতে তিন-চতুর্থাংশ গবাদিপশু মারা যায়। তবে শেষ দশকে কলেরা ও বসন্তরোগ মহামারি না হওয়ায় জেলাবাসী স্বস্তি পেয়েছিলেন।

বর্ধমান : এই জেলায় ফিভার জাঁকিয়ে বসায় তখন ঘরে ঘরে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে,  ১৮৬৯ সালে বর্ধমানের জনসংখ্যা ছিল ৪৬০০০। ১৮৭২ সালে তা কমে হয় ৩২৬৮৭। অর্থাৎ তিরিশ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় শুধুমাত্র এই কয় বছরে। তার অনেক আগে থেকেই বর্ধমানের জাঁকিয়ে বসেছিল এই জ্বর। চলেছিল আরও বেশ কয়ক বছর। তাই কত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তার একটা ধারণা এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। আর একটা পরিসংখ্যান রয়েছে কাটোয়ার একটি এলাকা কেন্দ্রিক। এই জ্বর মহামারির আকার নিয়েছিল কাটোয়ার আঠারোটি গ্রামে। কাটোয়ার ওই আঠারোটি গ্রামে তখন জনসংখ্যা ছিল ১৪৯৮২ জন। তার মধ্যে ৬২৪৩ জনের মৃত্যু হয় শুধুমাত্র বর্ধমান জ্বরেই। অর্থাৎ বর্ধমান ফিভারে ওই আঠারোটি গ্রামের প্রায় বিয়াল্লিশ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। 

বর্ধমানের বিশিষ্ট চিকিৎসক এস কে দাস বলছিলেন, ‘‘শুধু বর্ধমান নয়, তৎকালীন সময়ে দক্ষিণবঙ্গের একের পরে এক গ্রাম উজাড় হয়ে গিয়েছিল। বহু জনপদ হারিয়ে যায়।’’ তাঁর কথায়, ‘‘১৮৭৪ সালে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট’ ওই মহামারিকে ‘বর্ধমান জ্বর’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যা আদতে ম্যালেরিয়া বলে মনে করা হয়। তবে কেউ কেউ ‘টাইফয়েড’ বা ‘কালাজ্বর’ বলেও মনে করেছিলেন।

বর্ধমানের ইতিহাস গবেষকদের দাবি, ‘বর্ধমান জ্বর’ নামকরণ নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কীভাবে এই রোগ বর্ধমানে এসেছিল, তা নিয়েও মতভেদ দেখা যায়। যা জানা যায়, বর্ধমান জেলায় এই জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ১৮৬২-৬৩ সালে। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত জ্বর স্থায়ী হয়েছিল। ১৮৭১ থেকে ১৮৭৪ সাল, এই তিন বছরে বর্ধমান জেলায় ‘বর্ধমান জ্বরে’ কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে নানা তথ্য-পরিসংখ্যান থেকে মনে করা হয়। এই ‘মহামারি’ আটকাতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইংরেজ সরকার এককালীন পাঁচ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে।

বর্ধমান থেকে প্রকাশিত ‘লোকভারতী’তে সঞ্জীব চক্রবর্তী একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘বর্ধমান জেলায় পূর্বস্থলীতে এই রোগ প্রথম দেখা দেয়। ১৮৬৭ সালে মেমারির ঘোষ গ্রামে, ১৮৬৯ সালে বর্ধমান শহরে সংক্রমণ শুরু হয়’। ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল গেজেট’ থেকে জানা যায়, তৎকালীন বর্ধমান জেলার মুখ্য পরিদর্শক (স্বাস্থ্য) গোপালচন্দ্র রায় জানিয়েছিলেন, ১৮২৪ সালে পূর্ব বঙ্গের (বর্তমানে বাংলাদেশের) যশোরে ‘অজানা জ্বর’-এর উৎপত্তি হয়। ১৮৬৩ সালে ইংরেজ সরকার জ্বরের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য রাজা দিগম্বর মিত্রের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। বর্ধমানের তৎকালীন সিভিল সার্জেন জন গে ফ্রেঞ্চ জানিয়েছিলেন, বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ‘এনডেমিক সেন্টার’ খুলতে হয়েছিল। ১৮৯২ সালে ডাকঘরের মাধ্যমে কুইনাইন বিলি করা হয়েছিল।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র মারফত জানা যায়, অবিভক্ত বর্ধমান জেলায় ঢোকার আগে এই জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল ২৪ পরগনা, হুগলি, মেদিনীপুর জেলায়। বর্ধমান রাজবংশ নিয়ে গবেষণা করা নীরদবরণ সরকার দাবি করেন, ‘‘বর্ধমান শহরের কাঞ্চননগরের জনপদ কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল। রাজা মহতাবচাঁদ জেলায় অনেকগুলি স্বাস্থ্যকেন্দ্র খুলেছিলেন। ইংরেজ সরকারকে নগদ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সাহায্যও করেছিলেন।

জ্বরের সংক্রমণ কিংবা মৃত্যুর কবল থেকে রেহাই পাননি ইউরোপিয়ানরাও। তাই ব্রিটিশ শাসকদের নথিপত্রে রোগটি পরিচিতি পেল, “বার্ডওয়ান ফিভার” নামে। বর্ধমানের সিভিল সার্জন মেজর জে জি ফ্রেঞ্চ অবশ্য তাঁর রিপোর্টে মন্তব্য করেছিলেন, “Calling a fever by the name of the place in which it is raging is certainly objectionable.”

আসলে সরকারি ভাবে রোগটি পরবর্তীকালে ‘বর্ধমান জ্বর’ হিসেবে নথিভুক্ত হলেও এর সংক্রমণের সূচনা কিন্তু অবিভক্ত বাংলাদেশের অন্তর্গত যশোরের ৩০ কিমি দূরের একটি গ্রাম মহম্মদপুরে ১৮২৪ সালে। এর আট-নয় বছর বাদে ১৮৩২-৩৩ সালে সেই জ্বর হানা দিল নদীয়ার উলা গ্রামে। তারও অনেক বছর বাদে ১৮৬২-৬৩ সালে হুগলির বলাগড়, বর্ধমানের পান্ডুয়া ও কালনার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এই জ্বর। আর তারপর তা আরও ভীষণ ভাবে কাবু করল পূর্বস্থলীর গ্রামবাসীদের। জ্বরের প্রকোপে প্রায় গোটা গ্রাম ছারখার হয়ে গেল। তখনই প্রথম পূর্বস্থলীর কিছু বাসিন্দা ব্রিটিশ সরকারকে রোগের কথা জানিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আর্জি জানালেন।

ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় চিকিৎসার পরিকাঠামো, পরাধীন মানুষের প্রতি ব্রিটিশ শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমকালীন সামাজিক অবস্থার সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ওই মহামারীর সূত্রেই। মারণ জ্বর ততদিনে একেবারে মহামারী হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বর্ধমান সহ অন্যত্র। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে বুঝতে পেরে জেলা শাসক ডব্লিউ-ই-ওয়ার্ড জৌগ্রাম ও মেমারিসহ চারটি এলাকায় ডিসপেনসারি খোলার নির্দেশ দিলেন। পরের বছর ১৫মে তিনি রিপোর্ট পাঠালেন, “এমন কোন দেশি লোক আর খুঁজে পাওয়া যাবে না যে না এই জ্বরে পড়েছে। বর্ধমানে এসে না থাকলে কারোর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, পরিস্থিতি কী ভয়াবহ এবং সাধারণ মানুষ কতটা অসহায়। আমার বাংলোয় কাজ করার মতো আর কোন ভৃত্য নেই… এই অবস্থায় কলকাতা থেকে নতুন কোন ভৃত্য আনানোর চেষ্টা করাটাও নিষ্ঠুরতা। বাধ্য হয়ে আমি আপাতত আমার সদর দপ্তর রানিগঞ্জে স্থানান্তরিত করছি। ধনী-দরিদ্র কেউ বাকি নেই, এমনকি ইউরোপিয়ানরাও জ্বরে আক্রান্ত।”

১৮৭২ সালের ২৮শে জুন বর্ধমানের পরবর্তী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি টি মেটকাফ যে রিপোর্ট পেশ করলেন তাতে ভয়াবহতার চিত্রটি আরও পরিষ্কার — “সরকারি অফিসগুলিতে কেরানি, আমলা, আর্দালি, চাপরাশি থেকে শুরু করে পদস্থ আধিকারিকরাও জ্বরে শয্যাশায়ী। কর্মীর অভাবে সব দপ্তর খাঁ-খাঁ। একজন-দুজনকে যদিও বা দেখা যায় তাদের চেহারা শীর্ণ, রক্তশূন্য। জেল হাসপাতালে কয়েদি-রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। জ্বরেই মৃত্যু হল ইউরোপীয় মহিলা গিসবোর্নের। তাঁর স্বামীর অবস্থাও মরণাপন্ন। জেলার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে সিভিল সার্জন ছুটির দরখাস্ত করে বিদায় নিলেন। বর্ধমান ছেড়ে চলে গেলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানির কর্মীরাও। অফিসে কর্মী নেই, গৃহ ভৃত্য-শূন্য, পুরসভার ঝাড়ুদার ও সাফাই কর্মী অমিল। অবস্থা এমন, যে পুলিস কনস্টেবলের পাহারায় আসামীকে পাঠানো হচ্ছে, সেই আসামীই হঠাৎ জ্বরের ঘোরে মূর্ছা যাওয়া সিপাইয়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত।” বীরভূমের সিভিল মেডিকেল অফিসার ডাঃ আর এ বেকার রিপোর্ট দিলেন, জ্বরের সংক্রমণে গ্রাম-শুদ্ধ লোক এমন কাবু যে ধান কাটবার মজুর পর্যন্ত নেই।

ব্রিটিশ মেডিক্যাল অফিসার এবং ইঞ্জিনিয়াররা জ্বরের সংক্রমণ ছড়ানোর কারণ হিসেবে মূলত ধান খেতে জমে থাকা জল এবং পাড়া-গাঁয়ের নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশকেই দায়ী করলেন। নিজেদের প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়াতে মহামারীর জন্যে পরাধীন দেশকেই “land of dirt, disease, and sudden death” বলে দাগিয়ে দেওয়াটা ছিল সাধারণ রেওয়াজ। কিন্তু এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে “হিন্দু প্যাট্রিয়ট” কাগজে ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে ১৮৭৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অবধি মোট ১৪টি নিবন্ধ লিখলেন ১৮৬৪ সালের এপিডেমিক কমিশনের ভারতীয় সদস্য রাজা দিগম্বর মিত্র। ১৮৫১ সালের ২৯ অক্টোবর কলকাতার কাসাইটোলায় (বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট) গঠিত ব্রিটিশ ইন্ডিয়া এসোসিয়েশনেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। নীল চাষের সমস্যায় রায়তদের পক্ষ নিয়ে ব্রিটিশদের কাছে সওয়াল করা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, সতীদাহ, শ্মশানঘাটের উন্নয়ন, খাজনার হারের ক্রমাগত বৃদ্ধি প্রভৃতি সামাজিক বিষয় নিয়ে আইনগত ভাবে ব্রিটিশদের মোকাবিলা করা ছিল সংগঠনের অন্যতম কর্তব্য। 

কাজেই দিগম্বর মিত্রের মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় সোচ্চার হলেন তখন তাঁর বক্তব্যকে ব্রিটিশরা অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। হুগলিতে জমিদারি চালানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল হওয়ায় তিনি বুঝেছিলেন, নতুন পাকা রাস্তা এবং রেলপথ নির্মাণ ও যত্রতত্র নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে এলাকার স্বাভাবিক নিকাশি ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে গেছে। আর সেজন্যেই গুরুতর হয়ে দেখা দিয়েছে জমা জলের সমস্যা, আগাছার প্রাচুর্য আর সব মিলিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মশার বংশ বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ। মূলত এই তীব্র সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৭৩ সালে এম্ব্যাঙ্কমেন্ট আইন বলবৎ করে নিকাশির যে কোন অবরোধ ভেঙে ফেলতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রথম সরাসরি ক্ষমতা দেওয়া হল। এছাড়া ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট ও লেফটেন্যান্ট প্রক্টরের নেতৃত্বে গঠিত হল ড্রেনেজ কমিটি। কমিটির রিপোর্টেও কিন্তু দিগম্বর মিত্রের বক্তব্যের সমর্থন মিলল। অবশেষে ১৯০৯ সালে পেশ হল ড্রেনেজ বিল। এলাকার জনস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত পরিবেশ তদারকির জন্যে স্যানিটারি কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছিলেন দিগম্বর মিত্র।

মহামারীর খবর কানে যেতেই পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বর্ধমানে পৌঁছে যান। অন্য সময় অভিন্ন হৃদয় বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্রের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করতেন। এবার তিনি একটি বাড়ি ভাড়া করে সেখানে গড়ে তুললেন দরিদ্র, অসহায় মানুষদের জন্যে দাতব্য চিকিৎসালয়। দায়িত্ব দিলেন প্যারীচাঁদের ভাইপো ডাক্তার গঙ্গানারায়ণ মিত্রকে। সর্বত্র ঘুরে দেখলেন শোচনীয় অবস্থা। বিনা চিকিৎসায় পথে-ঘাটে পড়ে রয়েছে মৃতদেহ। ব্রিটিশ সরকারকে লিখলেন তো বটেই, তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে নিজে কলকাতায় গিয়ে দেখা করলেন লেফটেন্যান্ট গভৰ্ণর উইলিয়াম গ্রে-র সঙ্গে। দাবি জানালেন, যোগ্য চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে জেলার বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী ডিসপেনসারি চালু করতে হবে। তাঁর চাপেই সরে যেতে হল জেলার অকর্মণ্য সিভিল সার্জনকে। এলেন সহানুভূতিশীল অন্য এক চিকিৎসক। বিদ্যাসাগর নিজে বিলোতে লাগলেন ওষুধ, পথ্য এবং জামা-কাপড়। খরচ হয়ে গেল ২০০০ টাকা। এর পাশাপাশি ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ সরকার ৭৬ টি নতুন ডিসপেনসারি চালু করল। সব মিলিয়ে তার সংখ্যা দাঁড়াল ১০২। মেডিকেল অফিসারের দেওয়া টিকিটের বিনিময়ে সেখান থেকে দেওয়া হত কুইনাইন যা ছিল তখন মহার্ঘ। তার সঙ্গে কিছু জায়গায় চালু হয়েছিল ৩৩ টি ত্রাণ কেন্দ্র। তার দায়িত্বে থাকতেন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। দুঃস্থ রোগীরা সেখান থেকে পথ্য অনুযায়ী দৈনিক রেশন হিসেবে পেতেন চাল, ডাল, তেল, মশলা, লবন ও কাঁচা আনাজ অথবা দুধ, সাবু বা সুজি ও চিনি। ব্রিটিশ প্রশাসনের সে সময়কার নথি থেকে দেখা যাচ্ছে, ডিসপেনসারিগুলিতে মোট ১২ লক্ষ ৭৫ হাজারেরও বেশি রোগী দেখা হয়েছিল। প্রতি মাসে শুধু কুইনাইন লাগত ১০০ পাউন্ড বছরে যার খরচ ছিল ৪৩৫২৪ টাকা। বর্ধমান মেডিকেল স্টোর থেকে ওষুধ খাতে বাৎসরিক খরচ হয়েছিল ৬০ হাজার ১৭৩ টাকা। এর সঙ্গে ছিল স্টোর কিপার ও কম্পাউন্ডারের মাসিক বেতন ১৪৬ টাকা, বাড়ি ভাড়া ২০ টাকা আর আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে মাসে ৭০ টাকা। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, ওই বছর রাম কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ২৭৬৬ টাকা। বলা হয়েছে, ওই ডিসপেনসারিগুলির জন্যে রাম পাঠানো হত ‘stimulant’ হিসেবে।

ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে কুইনাইন আবিষ্কার হয়েছিল ১৮২০ সালে। এবার বর্ধমান মহামারীর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলারা জ্বরগ্রস্ত রোগীদের ওপর ‘কুইনাইন’ বলে দেশি ডাক্তারদের চালানো ওষুধের কার্যকারিতাও পরখ করতে লাগলেন। ব্রিটিশ দাতব্য চিকিৎসালয় থেকে বিলি করা খাঁটি কুইনাইন বড়ি বা মিক্সচারকে ঘিরে অচিরেই গড়ে উঠেছিল কালোবাজার। সেই ভেজাল মিক্সচার বেচে এক শ্রেণীর অসাধু হাতুড়ে চিকিৎসক প্রচুর পয়সা কামাতে শুরু করে। কালোবাজারি ঠেকাতে ডাকঘর, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বা গ্রামের কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমেও কুইনাইন বিলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই হাতুড়ে চিকিৎসকদের পাশাপাশি আবার দেখা যায় কিছু দেশি ডাক্তারবাবু ক্রমে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন। 

১৮৭০ সালে কলকাতা ও বোম্বাইয়ের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল করাল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিবিধ মহৌষধে’র। রোগীদের অবস্থার কথা জেনে নিয়ে তিনি ডাকযোগেই ওষুধ পাঠাতেন। এমনই ভাবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিনাজপুর, বারাণসী ও লাহোরেও। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে তারাশঙ্করের “আরোগ্য নিকেতন” — “দেশে তখন ম্যালেরিয়ার মহামারণ চলছে — বিলাতি ডাক্তারির হাঁকে ডাকে, সরকারি অনুগ্রহে তার পসারে কবিরাজদের ঘরগুলি বন্ধ হতে শুরু হয়েছে। দেশে বৈদ্যের অভাব। সেই সময়ে এই সব আধা-ডাক্তারেরা অনেক কাজে এসেছিল। শতমারি ভবেদ বৈদ্য সহস্র মারি চিকিৎসক।” জ্বরের চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন যদুনাথ মুখোপাধ্যায়। “সরল জ্বর চিকিৎসা” সহ তাঁর বেশ কয়েকটি বইও ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছিল। তবু জ্বর হলে কুইনাইন চিকিৎসাই হয়ে উঠল দস্তুর। সাধারণ মানুষের মাসকাবারি বাজার খরচের ফর্দে কুইনাইন স্থায়ী ভাবে জায়গা করে নিল। প্রতিদিন সকালে নিয়মিত কসরতের পর সেনাবাহিনীর জলখাবারে আবশ্যিক ছিল কুইনানাইনের প্রতিষেধক ডোজ। 

ব্রিটিশ প্রশাসকেরা কিন্তু রোগ সম্পর্কে দেশীয় সমাজের মতামতের ওপর নিয়মিত নজর রাখতেন। সেই কারণেই ১৮৭২ সালের আগস্ট মাসে ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রূক “বর্ধমান জ্বরের প্রকৃতি, কারণ ও প্রতিকারের শ্রেষ্ঠ উপায়” বিষয়ে দেশীয় নাগরিকদের মধ্যে এক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন যার পুরস্কার মূল্য ঘোষিত হয়েছিল সে আমলে এক হাজার টাকা। ভুললে চলবে না, দাতব্য চিকিৎসালয়গুলির মাধ্যমে ব্রিটিশরা দেশীয়দের মধ্যে পাশ্চাত্য চিকিৎসাপদ্ধতি জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। ওই কেন্দ্রগুলিতে কলেরা ও গুটি বসন্তের টিকাও দেওয়া হত। ১৮৬৭ সালে ৬১ টি ডিসপেনসারি দিয়ে শুরু হলেও ১৯০০ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে তারই মধ্যে ১৮৭০ সাল থেকে ঔপনিবেশিক প্রশাসন ওই সব ডিসপেনসারির আর্থিক দায়ভার থেকে নিজেদের ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। পরিবর্তে সেগুলি পরিচালনার যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডগুলির হাতে। আগে মানব-কল্যাণে জমিদাররা বড় বড় পুকুর ও দিঘি কাটাতেন। ক্রমে সে সব বন্ধ হয়ে গেল। সরকারও এ ব্যাপারে উদাসীন। কাজেই গ্রামের মানুষকে যাবতীয় নিত্য প্রয়োজনে দূষিত জলাশয়ই ব্যবহার করতে হত। আর তা থেকেই ছড়িয়ে পড়ত নানান রোগ। জল সরবরাহ ও নিকাশির ব্যবস্থা করার ভারও এসে পড়ল ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডগুলির ওপরেই। ফলে খরচের সংস্থান করতে বছর বছর নাগরিকদের ওপর খাজনার হার বাড়ানো ছাড়া উপায় ছিল না। আর সেই নিয়ে গ্রামবাসীরা হয়ে উঠল ক্ষুব্ধ। তাছাড়া বিশেষত ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর থেকে সমাজের গোঁড়ামি ও বিরোধিতার ভয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন স্বাস্থ্য ও নিকাশি, ব্যক্তিগত সমস্যা বা পরিচ্ছন্নতা সুনিশ্চিত করার বিষয়ে সরাসরি নাক গলাতে অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ওঠে। এরপরে ১৮৯৭ সালের মহামারী আইন রোগ নিয়ন্ত্রণে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দেয়। স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না দেখার জন্যে ইন্সপেক্টরদের বাড়ির অন্দরমহলেও প্রবেশের ঢালাও অধিকার ছিল। কঠোর কোয়ারেন্টাইন নীতি ও আবশ্যিক পরিদর্শনের বাড়াবাড়ির বিস্তর নজিরকে ঘিরে দেশীয় নাগরিকদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ দেখা দেয় — অনেক ক্ষেত্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামাও বেঁধে যায়।

একের পর এক মহামারীর প্রকোপে প্রাণহানি রুখতে এবং ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাদের মধ্যে রোগের সংক্রমণ ঠেকানোর উপায় বাতলাতে ব্রিটিশ সংসদ ১৮৬০ সালে রয়্যাল কমিশনকে ভারতে পাঠিয়েছিল। তার সুপারিশ অনুযায়ী অবিভক্ত বঙ্গ, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে জনস্বাস্থ্য বিধি তদারকির জন্যে তিন জন স্যানিটারি কমিশনার নিয়োগ করা হয়। ১৮৮০ সালে তার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে এক জন করে ডেপুটি স্যানিটারি কমিশনারও নিযুক্ত হন। বিভিন্ন অঞ্চলে সরেজমিন তদন্তের পর স্যানিটারি কমিশনের রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়, সরকারি খরচে নিয়মিত কার্পণ্যের দরুণই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলার অভাব রয়েছে। সীমিত ক্ষমতায় স্যানিটারি কমিশন কিছু কিছু উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা যে করেছে তার সাক্ষ্য রয়েছে তারাশঙ্করের লেখায় — “একদল এল স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। একদল এল কী নাম যেন তাদের? কোদালির পর কী? কোদালি ব্রিগেড। শুকনো পুকুরের তলায় কুয়ো কেটে তারা জল বের করলে। তাই তো? কথাটা তো কারুর মনে হয় নি! স্যানিটারি ইন্সপেক্টরেরা পুকুরে পুকুরে ব্লিচিং পাউডার গুলে দিয়ে জলকে শোধন করলে। এন্টি-কলেরা ভ্যাকসিন ইনজেকশন দিলে। কলেরার টিকে।” তা সত্ত্বেও বর্ধমান ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে প্রকাশিত হিসেবে জানা যায়, ১৮৬২ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে জেলার মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরই মৃত্যু হয়েছিল ম্যালেরিয়ায়। ১৮৭৬ সালে বাংলা সাময়িকপত্র ‘সাধারণী’ কয়েকটি গ্রামের দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখিয়েছিল, সেখানে পরপর দু-তিন বছরে পরিবারগুলোতে নতুন কারও জন্ম হয় নি। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যনীতির সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন স্যার রোনাল্ড রসের মতো চিকিৎসকও। তিনি বলেছিলেন, শুধু কুইনাইন দিলেই হবে না, উপযুক্ত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

দেড়শো বছর আগে মারণ 'বর্ধমান জ্বর' প্রতিরোধে বাংলা সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছিল তার রিপোর্ট দিয়েছিলেন বর্ধমানের সিভিল সার্জেন মেজর জন গে ফ্রেঞ্চ। এই রোগ এবং চিকিৎসা সম্পর্কিত বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায় তৎকালীন বর্ধমানের ডিস্পেনসারি সমূহের পরিদর্শনকারী মেডিক্যাল অফিসার ডা. গোপালচন্দ্র রায়-এর 'দ্য কজেস, সিম্পট্মস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট অব বার্ডোয়ান ফিভার অর দ্য এপিডেমিক ফিভার অব লোয়ার বেঙ্গল' গ্রন্থেও। এন্ডেমিক মহামারী হুগলি  হাওড়া জেলায় ১৮৫৭ থেকে ১৮৭৭ এবং বর্ধমান জেলায় দাপিয়ে বেড়ায় ১৮৬১-৬২ থেকে ১৮৭৪ সাধারণাব্দ পর্যন্ত এবং এই সময়পর্বে মৃত্যু ঘটিয়েছিল প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের। সরকারিভাবে ব্যাপক হারে ডিস্পেনসারি খোলার তথ্য পাওয়া যায় কিন্তু ১৮৭১-৭২ সালে। প্রথম দিকে চিকিৎসার জন্য নির্ভর করতে হত দেশীয় পণ্ডিত এবং হাতুড়েদের ওপরই। জানা যায়, জামালপুরের এক পণ্ডিত নিজস্ব ফর্মুলায় একটি মিক্সচার তৈরি করে তাঁর ভাগ্য ফিরিয়েছিলেন। প্রতিদিন প্রায় ১০০ বোতল করে বিক্রি হওয়া ডি এন গুপ্তর মিক্সচার প্রথম দিকে খুব সাড়া ফেলেছিল। তারপর সরকারিভাবে এন্ডেমিক ডিস্পেনসারি থেকে বিনামূল্যে কুইনাইন সরবরাহ শুরু হলে বাজার পড়ে পণ্ডিতের। শুধু একজনের কথা বললেও প্রাণভয়ে গ্রামেগঞ্জে ভরসা ছিলেন এঁরাই।

দেশীয় কবিরাজরা নিজের মতো করে গোপন ফর্মুলায় চিকিৎসা চালিয়ে যেতেন। তাঁদের দেওয়া ওষুধ সম্পর্কে খুব বেশি জানাতেন না। তবু ফ্রেঞ্চ-এর দেওয়া তথ্য অনুসারে জানা যায় যে ছাড়া-না-ছাড়া বা পালি জ্বরে কাঁপুনির সময় রোগীকে কাঁথা-কাপড় মুড়ে রাখা হত এবং হাত-পা ঘষে বা উনুনের তাপ নিয়ে গরম রাখার চেষ্টা করা হত। জ্বরে গা-গরম থাকলে মার্কারি, হরিতকি, সোনাপাতার বটিকা খাওয়ানো হত। ঘাম দেখা দিলে প্রচুর ঘাম হওয়ানোর জন্য বন হলুদ, ঝিনুক পোড়া পাউডার গায়ে মাখিয়ে মালিশ করা হত। সে-সময় জনপ্রিয় হয়েছিল 'রসসিন্ধু' নামে লাল মিশ্রণ এবং আর্সেনিক মেশানো বিষ বড়ি। (এই 'বিষ বড়ি'র কথা রবীন্দ্রনাথ 'ডাকঘর' নাটকে কবিরাজের মুখে বলিয়েছিলেন।) নাছোড় জ্বরের ক্ষেত্রে কবিরাজি পাচন, নিম, গুলঞ্চ, চিরতা দেওয়া হত। মাথার যন্ত্রণার উপশমে গরম বালির পুঁটুলির সেঁক দেওয়া হত। জ্বর ছাড়াতে সে-সময় খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেওয়ার রীতি ছিল এই ধারণা নিয়ে যে, খেতে না দিলে জ্বর এমনিই পালাবে। মৌরি ভিজে জল এবং নিমপাতার ক্বাথ সামান্য পরিমাণে দেওয়া হত জলতেষ্টা কমাতে।

বর্ধমান শহরে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে বিদ্যাসাগরের ভূমিকার উল্লেখ আছে তাঁর ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রণীত 'বিদ্যাসাগর-চরিত', সুবলচন্দ্র মিত্রের 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : আ স্টোরি অব হিজ লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক' প্রভৃতি গ্রন্থে। ১৮৬৯ সালে বিদ্যাসাগর প্যারীচরণ মিত্রের বাড়ির কাছে রসিককৃষ্ণ মল্লিকের বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। কাছাকাছি মুসলমান পল্লির জ্বরে আক্রান্ত গরিব মানুষদের চিকিৎসার জন্য তিনি ভাড়াবাড়িতেই একটি ডিস্পেনসারি খোলেন। সেটির ভার দেন প্যারীচরণের ভাইপো ডাক্তার গঙ্গানারায়ণ মিত্রকে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। তাদের ওষুধপত্রের সঙ্গে দুধ সাগু, সুরুয়ার জন্য পয়সাও দেওয়া হত। শুধুমাত্র বস্ত্রদানের জন্য বিদ্যাসাগর খরচ করেছিলেন প্রায় ২০০০ টাকা। কুইনাইন দুর্মূল্য হবার কারণে তার বদলে সিঙ্কোনা দেবার পরামর্শ দিয়েছিলেন গঙ্গানারায়ণ। বিদ্যাসাগর কিন্তু পরামর্শ মানেননি। তাঁর মত ছিল, 'যখন পীড়া একই প্রকারের, তখন বড়লোক ও দরিদ্র ব্যক্তিনির্ব্বিশেষে একই প্রকার ঔষধ হওয়া উচিত।' দু-বছর এভাবেই বর্ধমানে 'ভালোবাসার শ্রম' দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর।

মানবদরদি বিদ্যাসাগর মারণ জ্বরের প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। কিন্তু বর্ধমানের তৎকালীন সিভিল সার্জেন ডাক্তার মেল্টন মারণ জ্বরের কথা, চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কথা, চিকিৎসাহীনতায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর কথা গুরুত্ব সহকারে জানাননি তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইলিয়াম গ্রে সাহেবকে। প্রকৃত অবস্থার চিত্র তুলে ধরার কাজটি করেন বিদ্যাসাগর। বিরক্ত গ্রে সাহেব ডাক্তার এলিয়টকে বর্ধমানে পাঠান, ছুটিতে যান মেল্টন। অবস্থা বুঝে এলিয়েট সাহেব চার-পাঁচটি ডিস্পেনসারি খোলেন। ডাক্তাররা যাতে রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন তার ব্যবস্থা, অন্নসত্রে দুধ, সাগু ইত্যাদি দেবার ব্যবস্থা হয়। বিলাত ফেরত ডাক্তার গোপালচন্দ্র রায়, ফকিরচন্দ্র ঘোষ, রসিকলাল দত্ত, প্রিয়নাথ বসু প্রমুখকে ইন্সপেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করেন।

সরকারি স্তরে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধকল্পে চিকিৎসা এবং খাদ্য সরবরাহ- দু'দিকেই নজর দেওয়া হয়েছিল। ১৮৭১ সালে বর্ধমান জেলায় ২৫টি এবং পরের বছরই ৮০টি ডিস্পেনসারি খোলা হয়েছিল। ডিস্পেনসারিগুলিতে রোগীর ভীষণ চাপ থাকায় কিছু সরকারি এবং দেশীয় চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছিল গ্রামের একেবারে শয্যাশায়ী বা ডিস্পেনসারিতে আসতে অপারগ রোগীদের বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা প্রদান করতে। এই কাজের জন্য তাঁরা মাসে বেতন পেতেন এক পাউন্ড করে। কার্পণ্য না করেই ওষুধ বিলি করা হত। ১৮৭২ সালে শুধুমাত্র বর্ধমান মেডিক্যাল স্টোর থেকে যে পরিমাণ ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছিল তার মূল্য ছিল ৬০১৭ পাউন্ড ৬ সিলিং ৯ পেনি। এ্রর মধ্যে শুধুমাত্র কুইনাইনের অর্থমূল্য ছিল ৪৩৫২ পাউন্ড ৮ সিলিং ৩ পেনি, অর্থাৎ মোট খরচের প্রায় ৭২ শতাংশ। বোঝাই যাচ্ছে যে মূল ওষুধ ছিল কুইনাইন। হান্টার সাহেবের 'আ স্ট্যাস্টিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব বেঙ্গল'-এ উদ্ধৃত তথ্য অনুসরণ করে বলা যায়, এই ডিস্পেনসারিগুলি কোথাও এক মাস, কোথাও দু-মাস আবার কোথাও এক বছর রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হত। আবার কোনো জায়গায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ডিস্পেনসারি পুনরায় খোলা হত।

ছাপান্নটি সরকারি ভ্রাম্যমান বিশেষ ম্যালেরিয়া চিকিৎসাকেন্দ্র ছাড়াও ১৮৭২ সালের শেষদিকে ৬টি ব্যক্তিগত এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হাসপাতাল এবং দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র মূলত 'বর্ধমান জ্বর' প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। এই ডিস্পেনসারিগুলি ছিল---(১) বর্ধমান টাউন ডিস্পেনসারি : ১৮৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ডিস্পেনসারি বর্ধমান জ্বর মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেনের তত্ত্বাবধানে। ১৮৭১ সালে ৬৪৭ জন ইনডোর এবং ৭৩৭৬ জন আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত হন। পরের বছর সংখ্যাগুলি বেড়ে হয় যথাক্রমে ৮৮১ এবং ৮৫০১। এদের সিংহভাগটাই ছিল ম্যালেরিয়া রোগী। (২) চকদিঘি ডিস্পেনসারি: ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাকেন্দ্রটি চলত স্থানীয় জমিদার সারদাপ্রসাদ সিংহরায় (প্রয়াণ ১৮.০৩.১৮৬৮) সৃষ্ট ট্রাস্ট-এর পৃষ্ঠপোষকতায়। ১৮৭১ সালে ১৭৭ জন ইনডোর এবং ৪৫২৬ জন আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত হন। পরের বছর সংখ্যাগুলি হয় যথাক্রমে ২৩১ এবং ৭৬৯০। (৩) কাটোয়া ডিস্পেনসারি (১৮৬০): ১৮৭১ সালে এবং ১৮৭২ সালে ইনডোর এবং আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল ১২৩, ২৮৭৮ এবং ১৬২ ও ৪৪৪০। (৪) বুদবুদ ব্রাঞ্চ ডিস্পেনসারি (১৮৬৪)-তে শুধুমাত্র আউটডোরে রোগীরা চিকিৎসা পেত। ১৮৭১ ও ১৮৭২ সালে চিকিৎসাপ্রাপ্ত হন ১৫১৪ এবং ২৫৭৫ জন। (৫) রানিগঞ্জ ডিস্পেনসারি (১৮৬৭): ১৮৭১ সালে ১৮৯ জন ইনডোর এবং ৭৬৪ জন আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত হন। পরের বছর সংখ্যাগুলি হয় যথাক্রমে ২১৩ এবং ১১৩৮। (৬) জাহানাবাদ ডিস্পেনসারি (১৮৭১): ১৮৭২ সালে জাহানাবাদ (বর্তমান আরামবাগ) হুগলি থেকে বর্ধমান জেলায় স্থানান্তরিত হয়। সে-বছর ৪ জন ইনডোরে এবং ৯৭৪৯ জন আউটডোরে চিকিৎসাপ্রাপ্ত হন।

চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে পীড়িতদের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ১৮৭১ সালে তিনটি ডিপো---বালডাঙা, টিকরহাট এবং কাটরাপোতা থেকে ত্রাণ দেওয়া হত। ১৮৭২ সালে ত্রাণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কারা ত্রাণ পাবেন সেই সমস্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতেন গ্রামের প্রধান ব্যক্তিরা। সরকারি মেডিক্যাল অফিসার যাচাই করে খাদ্যসামগ্রী পাবার টিকিট বিলি করতেন। তারপর মহারাজার শস্যগোলা (গোলাবাড়ি) থেকে তা প্রদান করা হত। জেলার নানা প্রত্যন্তে ২২টি ডিপোর মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য অসুস্থ এবং দুঃস্থদের বিলি করা হত। ডিপোগুলি ছিল---বালডাঙা, টিকরহাট, কাটরাপোতা, সরাইটিকর, মাছখাণ্ডা, একলোকি, কুড়মুন, পলাশি, দিগলগ্রাম, জৌগ্রাম, শোর, কুলকোল, খানো, দীননাথপুর, খণ্ডঘোষ, সংসার, জাহানাবাদ, দেবীবরপুর, বালি, আউসগ্রাম, ওড়গ্রাম এবং তাসুলিতে।

বর্ধমান জ্বর প্রতিরোধে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা ছিল প্রকৃত মানবদরদির। ব্যক্তিমানুষের সুনাম কুড়োনোর লক্ষ্যে তিনি 'ভালোবাসার শ্রমে' নামেননি। তবু 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট'-এর মতো সমকালীন অগ্রণী পত্রিকাগুলি তাঁর ভূমিকাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। সময়ের প্রেক্ষিতে এখন অবশ্য ব্যক্তি গৌণ, প্রতিষ্ঠান বা দলই মুখ্য। প্যান্ডেমিক করোনায় ত্রাণ নিয়ে গণমাধ্যমের চাপান-উতোরে মনে হয় সম্প্রদান কম, বিজ্ঞাপন বেশি।

হাওড়া (পূর্বে হুগলি ও কলকাতার কিয়দংশ)

পুরনো হাওড়ার আধিব্যাধি ও চিকিৎসা
- প্রজেশ বন্দ্যোপাধ্যায়

একটি জেলার জনসংখ্যার নিরীখে ৫০ হাজার সংখ্যাটা এখন হয়তো কম মনে হতে পারে৷ কিন্তু সময়টাকে শ-দেড়েক বছর পিছিয়ে দেওয়া হলে, এই সংখ্যাই বেশ বড় হয়ে ওঠে৷ আয়তনের দিক থেকে বাংলার ছোট জেলাগুলির মধ্যেই ধরা হয় হাওড়া জেলাকে৷ রাজধানী কলকাতার খুব কাছে হওয়ায়, জনঘনত্বে অবশ্য হাওড়া, অন্য জেলাকে টেক্কা দিতে পারে৷ সে যাই হোক, বলছি ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা, যা হয়েছিল প্রায় দশ বছরে৷ এখনকার দিনের মতো নামিদামী রোগ নয়, বিশেষ এক ধরণের জ্বরে ১৮৭২ থেকে১৮৮১ সালের মধ্যে হাওড়ার তিনটি থানায় মারা গিয়েছিলেন এতো মানুষ৷ রোগটার নাম বর্ধমান জ্বর৷ বর্ধমান জেলায় ১৮৬০ থেকে ১৮৭০ সালে এই জ্বরে চার লক্ষেরও বেশি মৃত্যু হয়৷ এই জ্বর মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়৷ পাশাপাশি জেলাতেও সংক্রামক এই জ্বর ছড়িয়ে পড়ে৷ ব্রিটিশ সরকারকে জ্বরের কারণ অনুসন্ধানে কমিশন বসাতে হয়েছিল৷ রোগের লক্ষণের দিক থেকে এটি ছিল কালাজ্বর ও ম্যালেরিয়ার মাঝামাঝি৷ জ্বর মহামারী প্রতিরোধে অনেক উদ্যোগকে ব্যর্থ করে ১৮৭৬ সালে আপনার থেকেই বন্ধ হয় এর উপদ্রব৷ করোণা সংক্রমন প্রতিরোধে যে হার্ড ইমিউনিটি'র কথা এখন শোনা যাচ্ছে, তাতেই যে জ্বর বন্ধ হয়েছিল, এমনটাই মনে হয়৷ হাওড়ায় আমতা, পাঁচলা ও জগৎবল্লভপুরেই ৫০ হাজারের অধিকাংশ মানুষ মারা যান, এই বর্ধমান জ্বরে৷ জনগণনার তথ্য বলছে এই জ্বরের প্রভাবে পাঁচলা ও জগৎবল্লভপুরের জনসংখ্যা ৩.৪% হারে কমে যায়৷ আমতায় কমে ০.৫% হারে৷ যার অর্থ মৃত্যু ছাড়াও আতঙ্কে মানুষ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান৷ ১৯১১ সালের জনগণনার হিসাব বলছে, একদশকে হাওড়ার গ্রামগুলি থেকে ১৫ হাজার মানুষ অন্যত্র চলে যান৷ মহামারী, বিশেষ করে কলেরা ও বসন্তে বাংলার বহু গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ার নজির আছে৷ হাওড়ায় জ্বরব্যাধিতে মৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি৷ জেলায় ১৮৯১ থেকে ১৯০৬ এই ১৬ বছরে মৃত্যুর হার ছিল প্রতি বর্গমাইলে ৩১.০৩ জন৷ এর মধ্যে জ্বরে মৃত্যুই ছিল বর্গমাইল পিছু ১৪.৪৫ জন৷ অবশ্য শুধু জ্বরই নয়, কলেরা ও বসন্তেও এই সময়ে বহু মানুষের মৃত্যু হোত৷ ১৮৯২ থেকে ১৯০৬ এই ১৫ বছরে কলেরায় প্রতি বর্গমাইলে চার জনের মৃত্যু হয়েছিল৷ এর মধ্যে ১৮৯৫ - এই হার প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১১.১০ জন ও ১৯০৭ এ ৭.৩৮ জন হয়৷ এই সময়ে বসন্তেও প্রতি বর্গমাইলে প্রায় ৪ জনের মৃত্যু হোত৷ এছাড়া আমাশয় ও ডায়রিয়াতেও ফিবছর হাওড়ায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতো৷ ১৮৯২ থেকে ১৯০৬ এ পেটের রোগে প্রতি বর্গমাইলে প্রায় পাঁচ জনের মৃত্যুর খবর সরকারী রেকর্ডে নথিভুক্ত হয়েছে৷ ১৯০৩ সালে এই হার বেড়ে ১১ ও ১৯০৪ এ ৭.১১ হয়েছিল৷ ১৯০০ থেকে পাঁচ বছরে ১২৭৭ জন জেলার বিভিন্ন স্থানে প্লেগে মারা যায়৷ হাওড়ায় বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ১৯০৬ সালে প্রাদেশিক আইনসভায় প্রশ্ন তুলেছিলেন বাবু অম্বিকা চরণ মজুমদার৷ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও পাণীয় জলের অভাবেই জেলায় মৃত্যু হার ছিল বেশি৷ ১৯০২ সালেও জেলায় বর্গমাইল প্রতি মৃত্যুর গড় হার ছিল ৩৫.২৬ জন৷ কখনও এই হার পঞ্চাশেও পৌঁছে যেত৷ ১৮৬২ তে হাওড়ায় পুরসভা কাজ শুরু করলেও, শহরে পাণীয় জল ও নিকাশির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তেমনভাবে ছিল না৷ কলেরার প্রাদুর্ভাব ছিল উল্লেখযোগ্য৷ হাওড়া শহরে কোনো কোনো চটকলের শ্রমিক মহল্লায় পরিশ্রুত জল দেওয়া হলেও, অধিকাংশ মানুষ গঙ্গা ও পুকুরের জল ব্যবহার করতো৷ ১৮৯৬ সালে হাওড়া ড্রেনেজ স্কিম ও শ্রীরামপুর থেকে পরিশ্রুত জল দেওয়া শুরু হলে কলেরা ও আন্ত্রিক রোগে মৃত্যুর হার কমে৷ খাটা পায়খানা থেকে রাত্রে মলবহনের ব্যবস্থা হয়৷  মালট্রেনের বগীতে করে বেলগাছিয়ায় খাটা পায়খানার সংগৃহীত মল পরিবহন করা হোত৷ বাধ্যতামূলক ভ্যাকসিন আইন থাকলেও, সাধারণ মানুষের অসচেতনতার ফলে সর্বজনীন টিকার ব্যবস্থা হতে উনিশ শতক পেরিয়ে যায়৷ শ্রমিকরা কাজে আসবে না, এই আশঙ্কায়, চটকলের ম্যানেজাররা, টিকাকরণে বাধা দিত  বলে প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ আছে৷ ১৮৯৯ সালে এরকম এক ঘটনায় জেলা শাসককে  হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল৷  তবুও পুরসভা কাজ শুরু করার পর ১৮৭২ এর মধ্যে টিকাকরণের ফলে মানুষের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হয়েছিল৷ শহরে ১৮৭০ এর আগে কোনো নিকাশী ব্যবস্থায় ছিল না৷ পুরসভার প্রাথমিক পর্বে কাঁচা ড্রেন কাটতেও মানুষ বাধা দিত বলে জানা যায়৷ শহরের নিকাশী ব্যবস্থার ত্রুটি, পাণীয় জলের সমস্যার ফলে এমনকি ১৯০২ ও ১৯০৭ সালেও মৃত্যুহার ছিল গ্রামের তুলনায় বেশি৷ হয়তো এই সব কারণেই মানুষ শীতলা, জ্বরাসুর, ওলাবিবি, ওলাইচন্ডী, পঞ্চানন্দ, ষষ্ঠী, রক্ষাকালীর মতো লৌকিক দেবদেবীর পুজোর ওপর ভরসা করতো৷ বাংলার অন্যান্য জায়গাতেও,  একই কারণে মানুষ এইসব দেবদেবীর পুজো করতো৷ কিন্তু একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে,হাওড়ায় মহামারীর সময় থেকেই এই লৌকিক দেবদেবীর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়৷ ভয়ে ভক্তির এই প্রথা জেলার অনেক জায়গায় টিকে আছে, যদিও জনস্বাস্থ্যের পুরনো বিপদ বর্তমানে কেটে গেছে৷ জেলায় জনস্বাস্থ্যের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই গড়ে উঠতে শুরু করে, একথা পরিস্কার৷ গ্রামগঞ্জ কবিরাজি চিকিৎসার খ্যাতি থাকলেও, মহামারী সামলানোর মতো সক্ষমতা এদের ছিল না৷ নানান কারণে হাওড়ায় মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করলে আঠেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৬৭) কোম্পানী শালিমার অঞ্চলে একটি বড় হাসপাতালের পরিকল্পনা করলেও, অর্থাভাবে তা কার্যকর হয়নি৷ জেলা হাসপাতাল গড়ে ওঠে আরও প্রায় একশো বছর পর (১৮৬১)৷ ব্রিটিশ সরকার, রেল, পুরসভা ও ব্যক্তিগত দানে বাংলার দ্বিতীয় বড় হাসপাতাল হয় হাওড়ায়৷ ডাক্তার পামার নামে এক মানবদরদী চিকিৎসক এই হাসপাতাল উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন৷ ১৯২৯-৩০ সালে এই হাসপাতালে দুটি ঘোড়ায় টানা অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা দিত৷ এ খবরে, কেউ অবাক হলে জানাই, কলকাতায় প্রথম অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা ছিল গরুর গাড়ির৷ সে যাই হোক, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য হাসপাতালের পাশাপাশি  হাওড়া শহরে চারটি ডিসপেন্সারী ছিল৷ জাহাজি নাবিকদের জন্য অবশ্য ১৮২৮ সালেই হাওড়া ঘাটে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল, যা ১৮৫০ এর দশকে রেলের কর্মকান্ডের সময় উঠে যায়৷ হাওড়ায় ডা: রবার্ট নিকোলাস নামে এক ইউরোপীয় চিকিৎসক ১৮৪৪ সালে এখনকার স্টেশন এলাকায় প্র্যাকটিস করতেন বলে জানা যায়৷ এছাড়া মিলিটারি অরফানেজের জন্যও চিকিৎসকের ব্যবস্থা ছিল৷ পরবর্তি সময়ে জেলায় বহু স্বনামধন্য চিকিৎসক হয়েছেন৷ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাও উন্নত হয়েছে, তবু এতো বছর পরেও জেলায় চিকিৎসা পরিষেবার খামতির কথা শোনা যায়।                                                                  

আলোচনা শেষ করার আগে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় কলকাতা মেডিকেল কলেজের জনপ্রিয় চিকিৎসক ডাক্তার কার্তিক চন্দ্র বসু ও বিশ শতকের শুরুতে তাঁর প্রবর্তিত শুধু স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বাংলা সংবাদপত্র “স্বাস্থ্য সমাচার”-এর কথা। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যোগ দিয়েছিলেন বেঙ্গল কেমিকেলে। সেখানে তিনি ওষুধ তৈরি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯১০ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত চলা সংবাদপত্রটিতে প্রাক-স্বাধীনতা যুগ পর্যন্ত প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধ এবং অন্যান্য প্রতিবেদনে ঔপনিবেশিক স্বাস্থ্য নীতির নিয়মিত সমালোচনা করা হয়েছে। ১৯২৫ সালে “গ্রামীণ পুণর্গঠন” শীর্ষক নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ আত্ম-জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেশে স্বাস্থ্যের হাল ফেরাতে হলে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে আত্ম-সচেতনতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯২৬ সালে সে সময়ের জনপ্রিয় মহিলা সাহিত্যিক প্রভাবতী দেবী সরস্বতীও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্যে ব্রিটিশদের দায়ী করে জোরাল ভাষায় নিবন্ধ লেখেন। ১৯৩০ সালের একটি সম্পাদকীয়তে নিম্নবঙ্গে প্রায় অর্ধ-শতক ধরে চলা মহামারী জ্বরের প্রাদুর্ভাবের জন্যে রাজা দিগম্বর মিত্রের তত্ত্বকে সমর্থন জানিয়ে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক গাফিলতির তীব্র নিন্দা করা হয়। পরের বছরই পৃথক এক সম্পাদকীয়তে ডাক্তার রমেশ চন্দ্র রায় কলেরা নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশদের ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরেন। ১৯২৩ সালে “দ্য ক্যালকাটা রিভিউ” পত্রিকায় প্রমথ নাথ বসু নিত্য নতুন অসুখের বাড়বাড়ন্তের জন্যে সরাসরি পাশ্চাত্য সভ্যতারই সমালোচনা করেন। তার আগে ১৯১২ সালের ‘প্রবাসী”তেও ব্রিটিশদের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অদক্ষতার নিন্দা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিটি পরাধীন জাতির মধ্যে ক্রমেই জোরাল হয়ে ওঠে।

...
তথ্যযসূত্র :

১। ‘আমার দেশ’, অশোক মিত্র ১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনগণনা, ১৯৫৪
২। ‘দ্য প্লেগ’, রাধাগোবিন্দ কর, সম্পাদনা সুবীরকুমার চট্টোপাধ্যায়, ২০১১
৩। মেদিনীপুর ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, এল এস এস ও’ম্যালি
৪। ‘এ স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব মেদিনীপুর’ ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার, ১৯৯৭
৫। বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, জে সি কে পিটারসন, ১৯১০
৬। আনন্দবাজার পত্রিকা, ০৫/০৪/২০২০
৭। এইসময় পত্রিকা, ২০/০৪/২০২০
৮। বেঙ্গলী নিউজ, ২৫/০৪/২০২০
৯। wbpublicnet আর্কাইভ, ১৮৭১
১০। district.ecours.gov.in, ২০১৮
১১। CDC আর্কাইভ

সহযোগী - প্রজেশ ব্যানার্জী