Egyptian Mythology: প্রাচীন মিশরের প্রাচীনতম দেবীর আড়ালে রয়েছে কোন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা? জানুন মিশরীয় পুরাণের কাহিনী - Pralipta

কোয়েল সাহা: ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত এমন অনেক রহস্যময় অতিপ্রাকৃতিক সত্য আছে যা আমাদের অবচেতন মনের কাহিনিবিশেষ‌। কিংবদন্তি সেইসব আশ্চর্য ইতিহাসের সাক্ষী হতে হয় কম বেশি অনেকেই। প্রাচীন মিশর বরাবর নিজের রূপেই নিজেকে আরও রহস্যময়ী ও লাবন্যময়ী করে বিশ্বের দরবারে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। মিশরের মমি থেকে শুরু করে ওখানকার স্থাপত্য-শৈলীর আড়ালে রয়েছে বহু জটিল রহস্যের ধাঁধা, যার উত্তর পাওয়া খুবই দুষ্কর। প্রাচীন মিশরে ২০০০ এর বেশি দেবদেবীর তালিকায় হাথোর ছিলেন এমন এক দেবী যিনি প্রতীকীভাবে মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গার সাথে যুক্ত ছিলেন। এই কাহিনীগুলো কি নিছক পৌরাণিক ইতিহাস নাকি সত্যি এর পিছনে আছে অন্য কোনো জটিল ধাঁধার সমীকরণ?

প্রাচীন মিশরের প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেব-দেবীদের সত্তা এবং তাদের প্রভাব। হাথর ছিলেন একজন প্রাচীন দেবী, যাকে অন্তত ২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে, দ্বিতীয় রাজবংশের সময় এবং সম্ভবত রাজা বৃশ্চিকের দ্বারাও গো-দেবতা হিসেবে পূজা করা হত। হাথর নামটি তারই দেওয়া, মিল্কিওয়ের আকারে অর্থাৎ রাতের আকাশকে বোঝানো হয়েছে যার ফলস্বরূপ আকাশের দেবতা হোরাসকেও বোঝায়। ‌হাথর ছিলেন প্রেমের দেবী। তার প্রতিকৃতি হল গরু বা গরুর মাথা কিংবা শিং এবং কানওয়ালা এক মানবী।

হাথর সঙ্গীত এবং মদিরার দেবী বলেই পরিচিত। তার উপসনাস্থল ছিল ডেনডেরা। তিনি মাতৃত্ব, সৃষ্টির দেবী। হাথোর যাকে শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের প্রত্যেক নারীর রক্ষাকর্ত্রী বলে মনে করা হত। গর্ভধারণ বা সন্তান জন্মদানের সমস্যা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য, হৃদয়ের সমস্যা থেকে শুরু করে নারীর সাথে সম্পর্কযুক্ত যেকোনো বিষয়ে তার ক্ষমতা ছিল। তবুও, তিনি একচেটিয়াভাবে মহিলাদের দ্বারা উপাসনা করতেন না এবং অন্যান্য দেবদেবীদের থেকে ভিন্ন, তার পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই পুরোহিত ছিল। তিনি মিশরের সিনাই এলাকার খনি রক্ষাকারী দেবী, হোরাসের পত্নী এবং হোর-মা তাওয়ী’র মা। গ্রীক পৌরানিক ভালবাসার দেবী আফ্রোদিতি’র সমকক্ষ।

মাতৃত্বের দেবী হাথোর গর্ভবতী নারী এবং ধাইয়ের রক্ষাকর্ত্রী। উর্বরতা এবং আর্দ্রতার দেবী হওয়ায় হাথোর নীল নদের প্লাবনের দেবী। এমন কী সিনাই উপত্যকার খনি শ্রমিকদেরও রক্ষাকর্ত্রী দেবীও ছিলেন। কেবল প্রাচীন মিশরই নয়-প্রাচীন মিশরের বাইরেও সেমেটিক পশ্চিম এশিয়া, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, লিবিয়া, এবং প্রাচীন ফিনিশিয় বিবলস নগরে হাথোর উপাসনা প্রচলিত ছিল। হাথোর প্রাচীন মিশরের প্রাচীনতম দেবী। গো- দেবী হিসেবে ২৭০০ খ্রিস্টপূর্ব হাথোর উপাসনার কথা জানা যায়।
প্রাচীন মিশরীয় পুরাণে হাথোর ছায়াপথ রূপে প্রকাশিত।

স্বর্গীয় গাভীর বাট থেকে দুধ ঝরছে এমন একটি দৃশ্য হাথোরকে নিয়ে কল্পনা করা হয়েছিল। হাথোর তার নাক্ষত্রিক পরিমন্ডল দ্বারা পরিচিত। যেমন ছায়াপথ, রাত্রির আকাশ কিংবা আকাশ দেবতা হোরাস। যা হোক। ছায়াপথকে সেইসময়ে প্রাচীন মিশরের মানুষ জলময় ভাবত। যেখানে নিত্য সূর্যদেব তাঁর সূর্যনৌকায় ভেসে বেড়ান। ছায়াপথ হল: আকাশের নীল নদ। হাথোর প্রাচীন মিশরে গাভীরূপে পূজিতা হতেন। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ছিল কৃষিভিত্তিক। কাজেই গোসম্পদের ভারি সম্মান ছিল প্রাচীন মিশরীয় সমাজে।হাথোর সমাজের প্রত্যেক নারীর রক্ষাকর্ত্রী বলেই হয়তো হাথোর সৌন্দর্যের দেবী এবং শিল্পকলার পৃষ্টপোষক। দেবীর জন্য ভক্তের উপহার হল দুটি আয়না। আয়নার ওপর হাথোর -এর ছবি আঁকা হত । হাথোরকে মনে করা হত জীবনের হৃদয়েশ্বরী- যিনি মদ সুগন্ধী আনন্দ প্রেম ও রোমাঞ্চের দেবী। এ জন্য বলা হয়েছে প্রাচীন মিশরীয় উপকথায় হাথোর- এর ভূমিকা অত্যন্ত জটিল। দেবীর প্রিয় পাথর ছিল ফিরোজা পাথর ম্যালাকাইট,ও প্রিয় ধাতু স্বর্ণ এবং তামা।

তাছাড়া অনেক কাহিনীতে হাথোরের উৎস সম্পর্কে বলা হয়েছিল। হাথোর সম্পর্কিত একটি প্রথলিত উপকথা হল: ...একদিন, দেবতা 'রা' স্বর্গ থেকে নীচের দিকে তাকালেন। বিতৃষ্ণ হয়ে দেখলেন তাঁর সন্তানেরা তাদের সৃষ্টিকর্তা বা পিতাকে ভুলে গেছে। তখন মানবজাতিকে শাস্তি দেবার কথা ভাবলেন দেবতা 'রা'। তিন দিন সময় নিদিষ্ট করে দিয়ে হাথোর কে তিনি জনগনের শাস্তির ভার দিলেন। কারন ছিল মানবজাতি তাদের স্রষ্টা সম্বন্ধে শ্রদ্ধাবান নয়‌। নির্দেশ পেয়ে ক্রোধান্বিতা হাথোর চিতাবাঘের রূপ ধরে পৃথিবীতে নেমে এল। দেবতা 'রা' নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গেলেন। পরের দিন দেবতা 'রা' ধরিত্রীর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে উঠলেন। কেননা হাথোর পৃথিবীর প্রায় সবাইকে হত্যা করেছে। দেবতা 'রা' এই হিংস্রতার এই রূপ দেখে উৎকন্ঠিত হয়ে উঠলেন। হায়! আমাকে উপাসনা করার জন্য আর কেউই রইল না! কাল বিলম্ব না-করে দেবতা রা মানবরূপে পৃথিবীতে এলেন। চারিদিকে রক্তে থই থই করছিল। রাস্তায় বুক সমান রক্ত। সেই রক্তে বার্লি এবং খেজুর মিশিয়ে দেবতা রা স্বর্গে ফিরে গেলেন। আবার হত্যাযজ্ঞ শুরু করার আগে হাথোর সূরার (beer) গন্ধ পেল। হাথোর সূরা পান করে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। দু’দিন দু-রাত্রি ঘুমালো। জেগে ওঠার পর হত্যার তিন দিনের বেধে দেওয়া সময় শেষ। মানবজাতি এই নৃশংসকতা থেকে বাঁচল। তাদের প্রাক্তন যন্ত্রণাদাতা 'রা' তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ উপকারী হয়ে উঠেছিল। তার রূপান্তরের পরে, হাথর পৃথিবীর শিশুদের জন্য শুধুমাত্র সুন্দর এবং উন্নত উপহার দিয়েছিলেন এবং এমন উচ্চ মর্যাদা গ্রহণ করেছিলেন যে মিশরের পরবর্তী সমস্ত দেবীকে হাথোরের রূপ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

অপরদিকে মিশরীয় পুরানে বলা হয়েছে, হাথরও ছিলেন দেবতা হোরাসের মেয়েলি প্রতিরূপ। আবার কিছু উপস্থাপনায়, তিনি হোরাসের স্ত্রী এবং মা। প্রকৃতপক্ষে, কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী, হাথর, সমস্ত দেবতাদের মতো যারা একে অপরের সাথে দেখা করতে উপভোগ করতেন, কখনও কখনও এডফুতে তার মন্দিরে হোরাস দেখার জন্য ডেন্ডারাহ থেকে তার মন্দির ছেড়ে চলে যান।হাথর মিশরীয় ইতিহাস জুড়ে অনেকগুলি রূপ ধারণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন দেবদেবীর সাথে যুক্ত ছিলেন, প্রথমে সেখমেটের সাথে এবং তারপরে আইসিসের সাথে। অবশেষে, তিনি অন্যান্য সমস্ত দেবীর উৎপত্তির জন্য দায়ী আদিম দেবী হয়ে ওঠেন। 

"স্বর্গের উপপত্নী" হিসাবে হাথর প্রতিদিন সূর্যের জন্ম দেওয়ার জন্য দায়ী ছিলেন। আকাশে তার স্থানের অর্থ হল যে তিনি "লেডি অফ স্টারস" ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, আকাশগঙ্গা ছিল স্বর্গীয় গাভীর মতো তার থলি থেকে প্রবাহিত দুধ। তার দুধ ফেরাউনকে সাহায্য করেছিল। এই চিত্রটি তাকে দেবী নাটের সাথে যুক্ত করেছে, যিনি নিজেকে আকাশ জুড়ে খিলান দিয়েছিলেন যখন শু তাকে নীচে থেকে সমর্থন করেছিলেন। মিশরীয় পুরাণে, মিল্কিওয়েকে গরুর দুধের সরোবর হিসাবে বিবেচনা করা হত। মিল্কিওয়েকে বাদুড় নামে একটি উর্বরতা গো-দেবী হিসাবে দেবী করা হয়েছিল।

মূলত হাথরকে একটি স্বর্গীয় গরু হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে একটি গরুর কান সহ একটি মহিলা হিসাবে এবং শিং সহ একটি হেডড্রেস এবং তাদের মধ্যে একটি সূর্যের চাকতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তার তল থেকে নিঃসৃত দুধ রাতের আকাশে স্বর্গীয় মিল্কিওয়ের প্রতীক।

মিশরীয় পুরানে বর্ণিত দেবদেবীরা আজও আমাদের কাছে এক রহস্যের সর্পকুন্ডলীর মতো,বার বার প্রশ্ন উঠছে বিশ্বের এই শক্তিধর ধর্ম ও দেবদেবীরা আজ কোথায়? আদৌও কী অস্তিত্বশীল ছিল নাকি সম্পূর্ণ ধারনাই কাল্পনিক?



... 
তথ্যসূত্র ও ছবি : ইন্টারনেট সূত্রে প্রাপ্ত